গেহলটের হাত-ছাড়া কুর্সি, পাইলটের কি ‘সাপে বর’?

  • By UJNews24 Web Desk | Last Updated 04-12-2023, 09:09:23:am

 তিনি ছাড়তে চান, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি তাঁকে ছাড়তে চায় না। বাহাত্তর বছর বয়সেও এমনই আত্মবিশ্বাস-উড়ানে সওয়ার হয়েছিলেন ৩ বারের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট। সেই আত্মবিশ্বাসের উড়ান মুখ থুবড়ে পড়ল রবিবার। বেলা গড়াতেই দেখা গেল একটু একটু করে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি দূরে সরছে অশোক গেহলটের থেকে। দিনের শেষে গোটা কুর্সিটাই ‘হাতছাড়া’ কংগ্রেসের। পালাবদল ঘটল রাজস্থানে। কার্যত মোদীর ম্যাজিকেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে মরুরাজ্যে ফের বিজেপি। অনেকেই মনে করছিলেন, চব্বিশে লোকসভা নির্বাচনের আগে এই পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হল সেমিফাইনাল। আর ১৯৯ আসন বিশিষ্ট রাজস্থান হল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ।  চব্বিশের ভোটের আগে দেশের কাছে শক্তিপ্রদর্শনের বার্তা দেওয়ার জন্য মরুরাজ্যের জয় যথেষ্ট। মোদী তা করে দেখালেন। সেক্ষেত্রে একদম পিছিয়ে গেলেন রাহুল গান্ধী। বলা ভাল ইন্ডিয়া জোটও। 

রাজস্থানে কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণ কী? পুঙ্খানুপুঙ্খ ময়নাতদন্ত হবে। তবে, রাজনৈতিক কারবারিরা প্রথমেই যে কারণটি বলে উঠবেন, তা হল অশোক গেহলট এবং সচিন পাইলটের মধ্যে চুলোচুলি। কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী, তা ঠিক করতে হিমশিম খেতে হয় হাইকম্যান্ডকে। ভোটের মুখে গেহলট-পাইলটের মান-অভিমানের খেলা এমন পর্যায়ের পৌঁছয়, দিশাহারা হয়ে পড়েন নিচুতলার কর্মীরা। কংগ্রেসের অন্তর্কলহের হাঁড়ি খোলা হাটে ভেঙে যায়। বাধ্য হয়ে ময়দানে নামেন মল্লিকার্জুন খাড়্গে এবং রাহুল গান্ধী। সচিন পাইলটের কয়েকটি দাবি মেনে তড়িঘড়ি তৈরি হয় ২৯ সদস্যের নির্বাচন কমিটি। ভারসাম্যের রাজনীতি করে অশোক গেহলট এবং সচিন পাইলটকে আপাতত শান্ত করা হয়। তবে, হাবেভাবে অশোক গেহলট বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস জিতলে মুখ্যমন্ত্রী তিনিই। কোনও রাখঢাক না করে হাসতে হাসতে বলেও দেন, “এক মহিলা আমায় বলছিলেন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আপনিই যেন চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁকে আমি বলেছি, মুখ্যমন্ত্রীর পদ আমি ছাড়তে চাই। সত্যিই চাই। কিন্তু মুখমন্ত্রীর কুর্সি আমায় ছাড়তে চায় না।”

এদিকে সচিন পাইলটও গত ৫ বছর ধরে ওই কুর্সি পাওয়ার আশায় চাতকপাখির মতো বসে ছিলেন। সুযোগও এসেছিল। ভেবেছিলেন এবার বোধহয় তাঁর কপালে শিকে ছিঁড়বে! কংগ্রেসের সভাপতি হতে চেয়েছিলেন অশোক গেহলট। তিনি বলেছিলেন, কংগ্রেস সভাপতি হলে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি ছেড়ে দেবেন। সে সময় ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নিয়ে সওয়াল করেছিলেন রাহুল। যদিও পরে তা হিমঘরে চলে যায় এই তত্ত্ব। অশোক গেহলটের দাবি ছিল, হাইকম্যান্ড চাইলে ভোটে লড়তেও রাজি। মুখ্যমন্ত্রী নিয়ে যখন সচিনের সঙ্গে চাপানউতর ক্রমবর্ধমান, তিনি মনে করেন, তাহলে দলের সর্বোচ্চ সিংহাসনটা তাঁকে দিয়ে দেওয়া হোক। যদি তা হত, তাহলে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী পদে অনায়াসেই বসতে পারতেন সচিন পাইলট। কিন্তু দক্ষিণাত্যের রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে কংগ্রেস সভাপতি বানায় হাইকম্যান্ড। সে সময়ের মতো গেহলট মুখ্যমন্ত্রী থেকে যাওয়ায়, রণে ভঙ্গ দিতে হয় সচিনকে।

হাইকম্যান্ড ভেবেছিল, ‘কর্নাটক মডেলেই’ রাজস্থানের কলহ দূর করা সম্ভব। প্রবীণ রাজনীতিবিদ সিদ্দারামাইয়া এবং তরুণ নেতা ডি কে শিবকুমারের যুগলবন্দিতে যেমন কর্নাটক হাসিল হয়েছিল, সেই ‘মডেলেই’ রাজস্থানেও জয় আসবে। কিন্তু ভোটের সময়ই বেঁকে বসেন সচিন পাইলট। নিজের সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অনশনে বসার হুঁশিয়ারি দেন সচিন। বুঝিয়ে দেন, তাঁর ঝুলিতে যা বিধায়ক আছে, এক চুটকিতে সরকার ফেলে দেওয়া যাবে। নিজের সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে জনমানসে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পেরেছিলেন তরুণ তুর্কি নেতা। কর্নাটকে সিদ্দারামাইয়াকে মুখ্যমন্ত্রী করায় আপাতভাবে ডি কে শিবকুমার মেনে নিলেও, প্রথম দিন থেকে আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল গেহলট-পাইলটের মধ্যে। আর এখানে হাইকম্যান্ডের ভূমিকাও দায়ী ছিল।

বরাবরই দিল্লিমুখী ভূমিকায় দেখা গিয়েছে হাইকম্যান্ডকে। প্রাদেশিক সমস্যা সেভাবে আমল দিতে কখনই দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গ দূরস্থান, রাজস্থান, পঞ্জাব, গুজরাট কিংবা মহারাষ্ট্র- যখনই প্রাদেশিক সমস্যা তৈরি হয়েছে, তৎপরতার সঙ্গে পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়েছে হাইকম্যান্ড। সেই ফাঁকে সরকার ভেঙে বিজেপি সরকার তৈরি করেছে কিংবা অমরিন্দর সিং, গুলাম নবি আজ়াদ, জিতিন প্রাসাদ, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার মতো নেতারা বেরিয়ে গিয়েছেন দল থেকে। তরুণ প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা ছাড়তেও ভয় পেতে দেখা গিয়েছে হাইকম্যান্ডকে। সেই ঘুরেফিরে সিদ্দারামাইয়া কিংবা গেহলটের উপরেই ভরসা রাখতে দেখা গিয়েছে। ব্রাত্য থেকে গিয়েছেন ডি কে শিবকুমার, সচিন পাইলটের মতো তরুণ নেতারা। দলে ছেড়েছেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া।

আগামীদিন মরুরাজ্যে কোনও বড় অঘটন না ঘটলে (যদি ঘোড়া কেনাবেচার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়) কংগ্রেসকে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। তখন অশোক গেহলটের বয়স হবে ৭৭ বছর। আর সচিন পেরবেন পঞ্চাশ। আগামী বছর লোকসভা নির্বাচন। এই পরাজয়ের পর চব্বিশে কাকে সামনে রেখে রাজস্থান কংগ্রেস এগোবে, দ্রুত বিরহ কাটিয়ে ঠিক করে ফেলতে হবে। সেই দিক থেকে সচিন আরও এককদম এগিয়ে গেলেন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। গেহলটের কুর্সি যাওয়ায় সচিনের কি তবে ‘সাপে বর হল’? পিকচার তাহলে ‘আভি বাকি হ্যায়…’। 

 

Share this News

RELATED NEWS